খবর

ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে সাতক্ষীরার

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২০ অক্টোবর, ২০২২, ১১:৩৭ পিএম। অনলাইন সংস্কার

ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে সাতক্ষীরার উপকূলবাসী। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুর্বল বাঁধ তাদের এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বঙ্গোপসাগরে বৃহস্পতিবারের মধ্যে লঘুচাপ সৃষ্টির বার্তা দিচ্ছে আবহাওয়া অফিস।

এ লঘুচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ারও আশঙ্কা করছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। ফলে পূর্ববর্তী দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন সাতক্ষীরার উপকূলবাসী।

ষাটের দশকে নির্মাণ করা এখানকার বেড়িবাঁধগুলো আর পুনর্নির্মাণ করা হয়নি। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে এসব বাঁধ এখন আর সামাল দিতে পারছে না ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কা। জিও ব্যাগের বালুর বস্তা আর রিং বাঁধ দিয়ে কোনোরকম টিকিয়ে রাখা হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ। এছাড়া বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য নেই পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টারও।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের শেষ জনপদ সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকা শ্যামনগর উপজেলার দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা। সুন্দরবনের কূল ঘেঁষা এই দ্বীপ ইউনিয়নের শেষ প্রান্তে খোলপেটুয়া নদীর তীরে বেড়িবাঁধে বসবাস করেন নুরজাহান বেগম। তিনি বলেন, ‘২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার পর নদীতে আমাদের ভিটামাটি বিলীন হয়ে যায়। স্থায়ী মেরামত না হওয়ায় এখনো সেখানে জোয়ার ভাটা চলছে। তখন থেকে আমরা বেড়িবাঁধের পাশে একটি ঘর তৈরি করে বসবাস করছি।’

নুরজাহান বেগম আরও বলেন, ‘এখানেও শান্তিতে নেই। গেল কয়েক বছরে ফণী, বুলবুল, আম্পানসহ একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আশ্রয়স্থলটি। শুনলাম আবার নতুন ঝড় আসবে এতে আবারও ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কায় আছি।’

সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় ২০০৯ সালের ২৫ মে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় আইলা। সে সময় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকা। এরপর ২০১৩ সালের ১৬ মে মহাসেন, ২০১৫ সালের ৩০ জুলাই কোমেন, ২০১৬ সালের ২১ মে রোয়ানু, ২০১৭ সালের ৩০ মে মোরা, ২০১৯ সালের ৩ মে ফণী, ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর বুলবুল আঘাত হানে। সর্বশেষ ২০২০ সালের ২০ মে বিকেলে সুন্দরবনের পাশ দিয়ে সাতক্ষীরা উপকূলে আছড়ে পড়ে ঘূর্ণিঝড় আম্পান। এ সময় বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন। যার ক্ষত শুকায়নি এখনো।

সেলিনার মতোই আতঙ্কে দিন পার করছে সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় বেড়িবাঁধের পাশে বসবাসরত হাজারো পরিবার। দুর্যোগ এলেই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন এখানকার মানুষ। নদীতে জোয়ারের পানি বাড়লেই বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় লোকালয়। লবণ পানি ঢুকে বিপর্যস্ত হয় জীবনযাত্রা। নষ্ট হয়ে যায় খাবার পানির উৎস। এছাড়া উপকূলে বসবাসরত বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য নেই পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টারও।

গাবুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর সোরা গ্রামের বাসিন্দা আবদুল গাজীর জমি নেই। নদীর পাশে সরকারি খাস জমিতে বসবাস তার। তিনি বলেন, ‘ঝড় এলেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হই আমরা। ঘরবাড়ি ফেলে রেখে সাইক্লোন শেল্টারে যেতে হয়। আমাদের বাড়ি থেকে সাইক্লোন শেল্টারের দূরত্ব প্রায় ৫ কিলোমিটার। তারপরও জীবন বাঁচাতে সবকিছু ফেলে রেখে কষ্ট করে আমরা সেখানে যায়।’

একই গ্রামের বাসিন্দা কৌতুরী বেগম বলেন, ‘ঝড় এলেই সবাই সাইক্লোন শেল্টারে যেতে বলে। কিন্তু বাড়িতে হাস, মুরগি, গরু, ছাগল ফেলে রেখে যেতে পারি না। অনেক সময় জীবন বাজি রেখে বাধ্য হয়ে বাড়িতে পড়ে থাকতে হয় ‘

গাবুরা ইউনিয়নের বাসিন্দা মনজুর গাজী বলেন, ‘ষাটের দশকে উপকূলীয় এলাকায় নির্মিত বেড়িবাঁধ ২০০৯ সালে আইলা ও সবশেষ ২০২০ সালে আম্পানের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। এখনো আমাদের ইউনিয়নে বেড়িবাঁধের ৮টি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। জোয়ারের পানি বাড়লেই বাঁধ ভেঙে আবারও প্লাবিত হবে বিস্তীর্ণ এলাকা। এর আগে বারবার বাঁধ ভাঙলেও টিকে থাকার স্বার্থে মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে রিং-বাঁধ দিয়ে পানি বন্ধ করে। তবে এখনো স্থায়ী বাঁধ হয়নি। এখন ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’-এর খবরে নতুন করে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এখানকার মানুষ।’

এ বিষয়ে গাবুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, গাবুরা ইউনিয়নে বাসিন্দা প্রায় ৪৫ হাজার অথচ এখানে সাইক্লোন শেল্টার আছে মাত্র ১৫টি। এত মানুষকে এ কয়েকটি সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব নয়। এছাড়া স্কুল, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন পাকা ভবনে অল্প কিছু মানুষকে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব। এত মানুষকে এ কয়েকটি সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব নয়।

মাসুদুল আলম আরও বলেন, ঝড়ের চেয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় ভয় বেড়িবাঁধ নিয়ে। আগে থেকে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ কোনো রকমে টিকে আছে। নদীর পানি বাড়লেই বিভিন্ন অংশে ভাঙন তৈরি হতে পারে। সরকার নতুন করে এখানে টেকসই বাঁধ নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ দিলেও কাজ শুরু হয়নি।

আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধগুলো সংস্কার করা হয়েছে। বাকি জায়গাগুলো পর্যায়ক্রমে সংস্কার হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুটি বিভাগের আওতায় সাতক্ষীরা জেলায় প্রায় ৭০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আছে। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে ৩৫টি পয়েন্ট, যার আয়তন প্রায় ২০০ কিলোমিটার।